প্রকাশের সময়: ২:০৩ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, নভেম্বর ৩০, ২০১৭
Close [X]

মানিকগঞ্জে মাদক মামলার আসামীর প্রেমে অন্ধ’ পুলিশ

গত ২৫ নভেম্বর সিংগাইর উপজেলা প্রশাসন আয়োজিত আনন্দ মিছিল ও আলোচনাসভায় উপস্থিত ছিলেন রমিজ উদ্দিন

মানিকগঞ্জ: ইয়াবা বিক্রির অভিযোগে গত ২১ সেপ্টেম্বর মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলা যুবলীগ সাধারণ সম্পাদক রমিজ উদ্দিনের নামে মামলা হয়। প্রকাশ্যে ঘুড়ে বেড়ালেও পুলিশ বলছেন রমিজ উদ্দিন পলাতক রয়েছে। এ কারণে তাঁকে গ্রেপ্তার করা যাচ্ছে না।

কিন্তু পুলিশের উপস্থিতিতেই প্রতিদিনই দলীয় কর্মসূচি ও  বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে এই যুবলীগ নেতাকে দেখা যাচ্ছে। এসব অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য, মমতাজ বেগম ও দলীয় নেতাকর্মীসহ সরকারি কর্মকর্তারা। এমনকি তাঁদের সাথে এই মাদক ব্যবসায়ী ছবি তুলে পোষ্ট করছেন ব্যক্তিগত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও। পুলিশের কর্তাব্যক্তি ও সংসদ সদস্যের সাথে মাদক স¤্রাট রমিজ উদ্দিনকে দেখে বিস্মিত সিঙ্গাইর উপজেলাবাসী।

মামলার এজাহার সূত্রে জানাযায়, যুবলীগ নেতা রমিজ উদ্দিন তাঁর দুই সহযোগী ইমরান, কুকিল গত ২০ সেপ্টেম্বর উপজেলার চর আজিমপুর এলাকায় ইয়াবার একটি চালান নিয়ে অবস্থান করছিল। খবর পেয়ে মানিকগঞ্জ জেলা গোয়েন্দা পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) আনোয়ার হোসেন সঙ্গীয় ফোর্স নিয়ে ওই এলাকায় অভিযান চালান। এ সময় ইমরানকে গ্রেপ্তার করতে পারলেও রমিজ ও কুকিল পালিয়ে যান। ইমরানের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় ৩০টি ইয়াবা ট্যাবলেট ও মাদক বিক্রির ২৬ হাজার টাকা। এ ঘটনায় গত ২১ সেপ্টেম্বর মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে রমিজ উদ্দিনসহ তিনজনের নামে সিংগাইর থানায় মামলা করেন এসআই আনোয়ার হোসেন। এজাহারে উল্লেখ করা হয় উদ্ধারকৃত ইয়াবা ট্যাবলেট ও নগদ ২৬ হাজার টাকা রমিজ উদ্দিনের। তিনি দীর্ঘদিন ধরে ইয়াবা ব্যবসার সঙ্গে জড়িত।

এ অভিযোগ অস্বীকার করে উপজেলা যুবলীগ সম্পাদক রমিজ উদ্দিন বলেন, তিনি মাদকব্যবসার সঙ্গে জড়িত নন। ষড়যন্ত্র করে তাঁর নামে মাদক মামলা দেওয়া হয়। তিনি দাবি করেন মামলার চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দেওয়া হয়েছে। সেখানে তাঁর নাম নেই।

রমিজ উদ্দিনের এমন দাবি প্রত্যাখ্যান করে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মানিকগঞ্জ জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের উপ-পরিদর্শক (এসআই) আশীষ কুমার স্যান্যাল জানান, এখনো মামলার চার্জশিট দেওয়া হয়নি, তদন্ত চলছে। রমিজ উদ্দিন ও মামলার অপর আসামী কুকিল পলাতক রয়েছে। তাঁদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

 

পুলিশ রমিজ উদ্দিনকে খুঁজে না পেলেও বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ ইউনেসকোর স্বীকৃতি উপলক্ষে গত ২৫ নভেম্বর সিংগাইর উপজেলা প্রশাসন আয়োজিত আনন্দ মিছিল ও আলোচনাসভায় উপস্থিত ছিলেন রমিজ উদ্দিন। এ অনুষ্ঠানে স্থানীয় সংসদ সদস্য মমতাজ বেগম, উপজেলা নির্বাহী অফিসার যুবায়ের হোসেন, থানার পুলিশ পরিদর্শক (ওসি) খন্দকার ইমাম হোসেন ও  উপজেলা আওয়ামীলীগ সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মাজেদ খানসহ স্থানীয় আওয়ামীলীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন। শোভাযাত্রার অগ্রভাগের এক পাশে দেখা যায় রমিজ উদ্দিনকে। তাঁর সামনেই ছিলেন সিংগাইর থানার এক কর্মকর্তা। আর মিছিলের অপর পাশে ছিলেন থানার পুলিশ পরিদর্শক (ওসি) খন্দকার ইমাম হোসেন। ২৯ নভেম্বর স্থানীয় একটি সাপ্তাহিক পত্রিকার প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে এই পুলিশ কর্মকর্তার পাশে অতিথির আসনে দেখা গেছে রমিজ উদ্দিনকে। দেন বক্তব্যও। উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন কণ্ঠশিল্পী মমতাজ বেগম এমপি।

এর আগে গত ১১ নভেম্বর ছিল আওয়ামী যুবলীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। এউপলক্ষে এদিন উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে আয়োজন করা হয় কেক কাটা ও আলোচনাসভার। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি মমতাজ বেগম এমপি ও রমিজ উদ্দিন একে অপরকে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কেক খাইয়ে দেন। সেখানে উপস্থিত ছিলেন সংসদ সদস্য মমতাজ বেগমের প্রটোকলের দায়িত্বে থাকা সিংগাইর থানার পুলিশ কর্মকর্তারা।

মমতাজ বেগম এমপি ও রমিজ উদ্দিন একে অপরকে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কেক খাইয়ে দেন

এছাড়াও প্রায় প্রতিদিনই দলীয় কর্মসূচীর পাশাপশি এমপি মমতাজ বেগমের সরকারী ও সামাজিক সব অনুষ্ঠানে রমিজ উদ্দিন সক্রীয় অংশগ্রহণ করছেন। এসব অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকেন স্থানীয় থানা পুলিশ।

এ ব্যাপারে সিংগাইর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মাজেদ খান বলেন, রমিজের নামে মাদক মাদক মামলার কথা কখনো শুনিনি। হয়ে থাকলে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। মাদক বিক্রির অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে রমিজ উদ্দিনের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি জানান।

সিংগাইর থানার পুলিশ পরিদর্শক (ওসি খন্দকার ইমাম হোসেন জানান, মামলা তদন্ত করছে জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ।  থানায় এখনো তদন্তের কোনো তথ্য জমা দেওয়া হয়নি। পৌছলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে সিংগাইর উপজেলা আওয়ামীলীগের একাধিক নেতা জানান, অনৈতিক কর্মকা-ে জড়িত থাকার অভিযোগে এর আগে রমিজ উদ্দিনকে উপজেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছিল। সে একাধিকবার মাদকসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে আটকও হয়েছিল। স্থানীয় এমপির ইচ্ছায় চলতি বছরের শুরুতে রমিজ উদ্দিন উপজেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক হন। পদ পাওয়ার পর সে জবরদখল ও মাদক ব্যবসাসহ নানা অপকর্মে জড়িয়ে পড়ে। তাঁর কর্মকা-ে দলের ভাবমুর্তি ক্ষুন্ন হচ্ছে। এমপি মমতাজ বেগমের অনুসারী হওয়ায় তাঁকে পুলিশসহ কেউ কিছু  বলতে সাহস পায়না।